আলমাস কবীরের ভ্রমণ ব্লগঃ ইস্তাম্বুল যাত্রীর ডায়েরী ১

0

সৈয়দ আলমাস কবির, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) বর্তমান কমিটির সভাপতি, আয়াল কর্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং  মেট্রোনেটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও তিনি ঢাকা চেম্বারের টেলিকম, আইসিটি এবং ইন্টেলেকচুয়্যাল প্রোপার্টি রাইটস স্ট্যান্ডিং কমিটির আহ্বায়ক, এফবিসিসিআই-এর দু’টি স্ট্যান্ডিং কমিটি (ই-কমার্স এবং টেলিকম ও আইটি) কো-চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বারের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

সাংগঠনিক কিংবা ব্যবসায়িক প্রায় সময়ই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ান তথ্যপ্রযুক্তি খাতের এই সংগঠক।সেখানকার কাজ-কর্ম সেরে দিনশেষে নিজের কর্মপ্রণালী এবং স্থানীয় অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তার ফেসবুক টাইমলাইনে। বাংলা ভাষার প্রাঞ্জল ব্যবহারে তাৎক্ষনিক মানসিক অবস্থা ফুটে উঠে তার লেখনীতে। এবারের ডায়েরীর আয়োজন ইস্তাম্বুল ভ্রমণ নিয়ে। চলুন পাঠক জেনে নেয়া যাক ইস্তাম্বুল ভ্রমনের অভিজ্ঞতা। আজ থাকছে ডায়েরীর  প্রথম পর্ব। 

সুবেহ সাদেকের আগেই ঢাকার বিমানবন্দরে এসে পৌঁছুলাম। সকাল সাতটা নাগাদ ছাড়বে বিমান। কয়েক ঘন্টা আগে থেকেই প্রস্তুতি পর্ব শুরু। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে করতে ছ’টা বেজে গেল। আমেরিকান এক্সপ্রেস-এর পুরোনো গ্রাহক হওয়ার বদৌলতে তা’দের বৈঠকখানায় বসে প্রাতঃরাশটা সারা গেল। বিমানে উঠেই হাতব্যাগটিকে মাঁচায় তুলে, চোখে কুলুপ এঁটে দিলাম ঘুম। উড়োজাহাজ আকাশে ওঠার পর তুর্কী বিমানবালা এসে আপ্যায়ন শুরু করলো। একবার ফলের রস খাওয়ায়, তো আবার কিছুক্ষণ পর এসে নাস্তা দিতে চায়। আমি একটু অবহেলার সুরেই বললাম, আমার এসব এখন দরকার নেই। আমি ঘুমোবো। বিমানবালা মৃদু হেসে আমার বিছানা করে দিতে চাইলো। নরম চাদর-বালিশ দিয়ে যত্ন করে বিছানা বানিয়ে মখমলে কম্বল এনে দিল সে। কতক্ষণ ঘুমালাম বলতে পারবো না, তবে চোখ খুলেই বুঝলাম আমি প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত। ঘন্টি বাজিয়ে সংকেত দিলাম আমি খেতে চাই। তারপর ভুড়িভোজ! যা’হোক, প্রায় নয় ঘন্টা আকাশপথে যাত্রার পর ইস্তাম্বুলের আতাতুর্ক বিমানবন্দরে অবতরণ করলাম।

ইস্তাম্বুলের বিমানবন্দের এর আগে বহুবার এসেছি। তবে প্রতিবারই দু-চার ঘন্টার যাত্রা-বিরতিতে। বিমানবন্দরের গণ্ডির বাইরে তাই কখনই যাওয়া হয়নি। এবারও যাত্রার মাঝপথ, তবে বিরতিটা ২১ ঘন্টারও বেশী। তাই, ভিসা নিয়েই এসেছি যাতে শহরে ঘোরা যায়। তুর্কী বিমানের অনুগ্রহে বস্ফোরাস প্রণালীর তীরে বেশ ভাল একটা হোটেলও পেয়ে গেলাম। তারাই নিয়ে গেল হোটেলে। মালপত্র রেখে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পরলাম আমি এবং আমার স্ত্রী। বলা হয়নি, আমাদের প্রধান গন্তব্য দক্ষিণ গোলার্ধে, যেখানে এখন বেশ গরম। শুধু ইস্তাম্বুলের জন্য হাতব্যাগে যে গরম কাপড়-চোপড় এনেছিলাম, তা’ গায়ে চড়িয়ে বেড়িয়ে পড়লাম পৃথিবী শাসনকারী বাইজ্যানটাইন ও পরবর্তীতে অটোম্যান সাম্রাজ্যের রাজধানী দেখার উদ্দেশ্যে।

আকাশের অবস্থা বিশেষ ভালো না। থেমে থেমেই বৃষ্টি পড়ছে। এমনিতে ৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস, কিন্তু সাথে বৃষ্টি থাকায় ঠাণ্ডায় হাড় কেঁপে যাচ্ছে। নিজেকে তিরষ্কার করলাম কেন দস্তানাগুলো সাথে নিয়ে আসিনি। পকেটেতো হাত রাখা যাচ্ছে না। অবলা-রক্ষণকারী পুরুষত্বের প্রমাণ দিতে গিয়ে ছাতা ধরতে হচ্ছে স্ত্রীর মাথার ওপর। অন্য হাতে ক্যামেরা। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে হাতে থ্রম্বোসিস হয়ে গেছে! যা’হোক, এর মধ্যেই এসে পৌঁছুলাম মধ্যযুগীয় সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম হাজিয়া সোফিয়ায়। ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের মূল উপাসনালয় হিসেবে হাজিয়া সোফিয়া তৈরী হয়েছিল ৫৩৭ খৃষ্টাব্দে। পরবর্তীতে এটাকে মসজিদে রূপান্তরিত করা হয়। ১৯৩৫ সাল থেকে এটিকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ যাদুঘরের মর্যাদা দেওয়া হয়। অনেক বাঙালীই হয়তো বিশাল গম্বুজ আর উঁচু মিনারওয়ালা এই ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য স্থাপনাটার নাম উচ্চারণ করতে গিয়ে নাক কুঁচকে ফেলেন; তাঁদেরকে আমি আশ্বস্ত করতে চাই যে, ইংরেজীতে এঁর নাম Hagia Sophia হলেও, এর প্রকৃত উচ্চারণ ‘হাজিয়া সোফিয়া’, যার বাঙলা অর্থ ‘পবিত্র জ্ঞান’। তুর্কী ভাষায় এরা এটিকে ‘আয়াসোফিয়া’ বলে থাকে।

হাজিয়া সোফিয়ার সামনেই নীল মসজিদ বা ব্লু মস্ক। ইস্তাম্বুলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর অন্যতম। অপূর্ব কারুকাজ করা আছে এই বিশাল মসজিদের ছাদে। প্লাস্টিকের ব্যাগে জুতো ভরে ঢুকলাম তুর্কী স্থাপত্যশৈলী দর্শনের উদ্দেশ্যে। অমুসলিমরাও ঢুকতে পারে এ মসজিদে। খৃষ্টান ও ইহুদী ধর্মের সাথে ইসলামের মিল ও ধারাবাহিকতা তুলে ধরে একজন বর্ণনা দিয়ে চলেছেন মসজিদের ভিতরে। আসরের আজান দিয়েছিল একটু আগেই। অনেক দর্শনার্থীই নামাজটা এই ফাঁকে সেরে নিলেন।

টপকাপি প্রাসাদও এর খুবই কাছে। এটি এখন একটি যাদুঘর। কিন্তু ৪টা বেজে যাওয়ায় আজ আর দেখা হলো না এই ১৫শ শতাব্দীর অটোম্যান সুলতানদের তৈরী প্রাসাদটি।

গ্র্যাণ্ড বাজার এশিয়ার একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিশাল বাজার। মিনিট কুড়ি হেঁটে আসলাম এই ছাদওয়ালা বিশাল বাজারে। সারি সারি দোকানগুলোতে বিক্রী হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী পণ্য থেকে শুরু করে হালফ্যাশনের নানান দ্রব্যাদি। আছে দুর্লভ শিল্পবস্তু; আছে নানান ইউরোপীয় ব্র্যাণ্ডের অনুকৃতিতে তৈরি পরিধেয়, ব্যাগ, ইত্যাদি; আছে নানাবিধ তুর্কী মিষ্টির সমাহার। সব মিলিয়ে গ্র্যাণ্ড বাজার কিন্তু সত্যিই গ্র্যাণ্ড! তবে পর্যটনের শহর হওয়া সত্বেও দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে যায় ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে। কী আর করা, তুর্কী ‘কেবাপ’ খেতে ঢুকে পরলাম এক রেস্তোঁরায়। ল্যাম্ব ডোনার কাবাব আর পাঁচমিশালী কাবাবের অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম। একহাত লম্বা এক নানরুটি নিয়ে হাজির হলো আমাদের বেয়ারা। জিগ্যেস করলাম, এট আবার কী। বললো, এট নাকি ‘পিটা ব্রেড’; এটা ছিড়ে ছিড়ে কেবাপ খেতে হবে। পাঁচমিশালী কাবাবগুলো মন্দ ছিল না, তবে ল্যাম্বের ডোনার কাবাব খেতে গিয়ে রীতিমত বমি চলে এল! এদের ভেড়ার মাংসের গন্ধ আমার ভাই পোষালো না!

কাবাবকে ‘কেবাপ’ বলে কেন এরা! বোধহয় আমাদের কাবাবের সাথে টেক্কা দিতে গিয়ে দাবি করতে চায়, “কে বাপ”! আর, ‘পিটা’ ব্রেডই বা বলে কেন! নাকি আমাদের নান-রুটির সাথে একইভাবে প্রতিযোগিতা করে বোধহয় বলে, এদেরটাই বাপ বা ‘পিতা’!!

আমাদের হোটেলটি ছিল বস্ফোরাস প্রণালীর তীরেই। এই প্রণালীটিই ভাগ করেছে এশিয়া আর ইউরোপকে। তাই বলা যায়, ইস্তাম্বুল শহরের এক অংশ এশিয়া মহাদেশে, আরেক অংশ ইউরোপে। আমার কেন জানি মনে হয়, এরা সবসময় নিজেদেরকে ইউরোপীয়ান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু, বাঁদুরকে যেমন পাখীরা বলে তুই জানোয়ার, আর জানোয়ারেরা বলে তুই পাখী, ঠিক সেরকমই ইউরোপীয়ানরা এদেরকে নিজেদের বলে মনে করে না, আর এশিয়ানদের দলে তো এরা নিজেরাই ভিড়তে চায় না।

কাল ভোরবেলা তুর্কী বিমানের গাড়ী আসবে আমাদের বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। দক্ষিণ গোলার্ধ সফরশেষে আবারও ফিরবো এই শহরে। আশা করছি দ্বিতীয় পর্বটা তখন লিখতে পারবো। প্রথমটার এখানেই ইতি।

মন্তব্য করুন

টি মন্তব্য

Share.

Comments are closed.